Monday, May 23, 2016

সফল মরশুম শেষে মোহন বাগানে বিস্তর ধোঁয়াশা । রাতুল ঘোষ - বর্তমান


প্রলম্বিত গ্রীষ্মের দহনজ্বালা শেষে বর্ষা আসতে আর বেশি দেরি নেই। হায়! এই সময়ে এখন আর কলকাতা ময়দানে ফুটবলের পদধ্বনি শোনা যায় না। অথচ পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে কলকাতার তিন বড় ক্লাব লিগের প্রথম ম্যাচটি খেলতে নামত ৯ থেকে ১৫ মে’র মধ্যে। এখন অবশ্য পুরো ফুটবল ক্যালেন্ডারই বদলে গিয়েছে। বুধবার গুয়াহাটিতে এএফসি কাপের ম্যাচ শেষ হলেই ২০১৫-১৬ মরশুমে ভারতীয় ফুটবলে যবনিকা নামছে। কোনও সন্দেহ নেই, এবারও দেশের সবচেয়ে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জনকারী ক্লাবের নাম মোহন বাগান। কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে আই লিগ খেতাব। তবু বিন্দুমাত্র হতোদ্যম না হয়ে মোহন বাগান ভারতের ‘চ্যাম্পিয়ন ক্লাব অব ইন্ডিয়া’ খেতাব ফেডারেশন কাপ জিতেছে। এই সাফল্যের জন্য কোচ সঞ্জয় সেন এবং সবুজ-মেরুন ফুটবলারদের বিপুল অভিনন্দন প্রাপ্য। 

কিন্তু আগামী মরশুমে মোহন বাগানের রোড ম্যাপ কী হবে তা অতিশয় ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন। সহ সচিব জানিয়ে দিয়েছেন, কলকাতা প্রিমিয়ার লিগে কোনও ভাবেই শক্তিশালী দলগঠন করা হবে না। কুড়িয়ে বাড়িয়ে হাতের কাছে যে সব প্লেয়ার পাওয়া যাবে তাদের নিয়েই কলকাতা লিগের জন্য গড়া হবে সবুজ-মেরুন ব্রিগেড। অর্থাৎ ইস্ট বেঙ্গলের ‘সাতে সাত’ হওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা মাত্র। আগামী মরশুম শুরু হওয়ার দু’মাস আগে নিজেদের কলকাতা লিগ খেতাবের লড়াই থেকে মোহন বাগান কর্তারা দু’হাত তুলে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন। 
এরপর আসা যাক, এএফসি কাপের প্রসঙ্গে। মঙ্গলবার গুয়াহাটিতে মোহন বাগান যদি ট্যাম্পাইন্স রোভার্সকে হারিয়েও দেয় তবু আগামী সেপ্টেম্বরে কোয়ার্টার ফাইনালে সবুজ-মেরুন ব্রিগেড খেলবে কি না তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
এই ধোঁয়াশাও তৈরি করেছেন মোহন বাগানের শীর্ষকর্তারা। এঁদের মধ্যে ক্লাবের সহ সচিব ফেড কাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বলেছিলেন, তাঁরা স্রেফ পাঁচ মাসের জন্য অর্থাৎ আগামী জানুয়ারি থেকে মে মাসের জন্য পূর্ণ শক্তির দল গড়বেন। অর্থাৎ মহাদেশীয় টুর্নামেন্ট এএফসি কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ভালো ফল করার কোনও উচ্চাশাই পোষণ করেন না শতাব্দী প্রাচীন, ঐতিহ্যশালী ক্লাবটির বর্তমান কর্তারা। তাই সনি নর্ডি, কাটসুমির মতো দুই ক্ষুরধার উইঙ্গারকে ছাড়াই মঙ্গলবার এএফসি কাপের ম্যাচে দল নামাচ্ছে মোহন বাগান। অথচ প্রতিপক্ষ ট্যাম্পাইন্স রোভার্সকে গত ২৭ জানুয়ারি কলকাতায় এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের প্লে-অফ ম্যাচে মোহন বাগান তিন গোলে হারিয়েছিল। 
এএফসি’কে মোহন বাগান কর্তারা নাকি চিঠি লিখে জানাবেন, আইএসএলের জন্য তাঁরা পূর্ণশক্তির দল কোয়ার্টার ফাইনালে নামাতে পারবেন না বলে খেলবেন না। কোনও ধারণা আছে, কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি ওয়াক ওভার দিলে মোহন বাগানকে কী পরিমাণ আর্থিক জরিমানা করতে পারে এএফসি?
সনি নর্ডি ও কাটসুমি ছাড়াই মোহন বাগান মঙ্গলবার যদি হেরে যায় তাহলে তো ল্যাটা চুকে গেল। কেউ কর্তাদের দোষ দেবেন না। জরিমানাও দেওয়ার প্রশ্ন নেই। আমার প্রশ্ন হল, এএফসি কাপের সেমি ফাইনালে উঠে ইস্ট বেঙ্গল ও ডেম্পো যখন নিকট অতীতে ভারতীয় ফুটবলে নজির গড়েছিল, সেটা দেখেও কেন মোহন বাগান কর্তারা উদ্বুদ্ধ হলেন না? মহাদেশীয় ফুটবলে দাগ কাটার উচ্চাশা কেন তাঁরা পোষণ করবেন না? 
হতে পারে, ক্লাবে প্রবল অর্থাভাবই এর একমাত্র কারণ। কিন্তু তাই বলে আন্তরিক চেষ্টা কেন থাকবে না?
বর্তমানে মোহন বাগানে স্পনসর নেই। অদূর ভবিষ্যতে আসবে কিনা সেটাও অনিশ্চিত। একটি ফরাসি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা মোটা অঙ্কের স্পনসরশিপ জোগাড় করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি অবশ্য দিয়েছিল। কিন্তু তাদের আবশ্যিক শর্ত, ক্লাবের ৫১ শতাংশ মালিকানা হস্তান্তর করতে হবে। এই প্রস্তাবে কখনওই রাজি হচ্ছেন না ক্লাবকর্তারা। তাঁরা মোহন বাগান ক্লাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বিন্দুমাত্র শিথিল করতে রাজি নন। ঘটনা হল, সারদা কেলেঙ্কারির পরিপ্রেক্ষিতে মোহন বাগান ও ইস্ট বেঙ্গলের দুটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এখনও ‘ফ্রিজ’ করে রেখে দিয়েছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। তদন্ত এখনও চলছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে কো-স্পনসররাও দুই বড় ক্লাবে অর্থ ঢালতে রাজি হচ্ছেন না। ইস্ট বেঙ্গল তবু বিজয় মালিয়ার কিংফিশার থেকে এখনও স্পনসরশিপ অর্থ পাচ্ছে। কিন্তু মোহন বাগানে এই অর্থের জোগান গত দেড় বছর ধরে বন্ধ। দুই শীর্ষকর্তা অর্থ ঢেলে ক্লাব চালাচ্ছেন। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলবে? এমনিতেই ইন্ডিয়ান সুপার লিগ নিয়ে ফেডারেশনের গত মিটিংয়ে মোহন বাগান কোনও শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাকে পাঠায়নি। এই নতুন লিগের রূপরেখা এখনও অনিশ্চিত। ইন্ডিয়ান সুপার লিগের বর্তমান আটটি ফ্র্যাঞ্চাইজি দল গত দুটি মরশুমে কমবেশি ৪০ কোটি টাকা করে লোকসান গুনেছে। এই পরিমাণ অর্থ কলকাতার কোনও দলের পক্ষে গুণাগার দেওয়া সম্ভব নয়। আগামী মরশুমেই হবে শেষ আই লিগ। তাই এখন থেকে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা না করলে পস্তাতে হবে দুই বড় ক্লাবকে। 
এমনিতেই নতুন প্রজন্মের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ঘরের বাঙালি ছেলেরা এখন আর নতুন করে মোহন বাগান বা ইস্ট বেঙ্গলের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। তাঁরা বিশেষভাবে মজেছে স্প্যানিশ লা লিগায় মেসি, রোনাল্ডো, নেইমার ও সুয়ারেজদের শিল্পকর্মে। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছেলেমেয়েরা এদের পাশাপাশি ইপিএলের খেলাও নিয়মিত দেখে থাকে। এখন বুন্দেশলিগা, ইতালিয়ান লিগ সিরি ‘এ’ এবং ফরাসি লিগের খেলাও ঘরে বসে টিভিতে দেখা যায়। নতুন প্রজন্মের মধ্যে ফ্যান বেস বাড়ানোর কোনও চেষ্টাই করেননি মোহন বাগান ও ইস্ট বেঙ্গলের কর্তারা। তাই ষাট বা সত্তর দশকে কলকাতা ময়দানের ঘেরা মাঠে যেমন ষোলো সতেরো হাজার দর্শক নিয়মিত বড় দলের খেলা দেখতে ভিড় করতেন এখনও মোহন বাগানের খেলা থাকলে গড় সমর্থকদের উপস্থিতি মোটামুটি একই রয়েছে। ফেসবুকে বিপ্লব করে ফ্যানবেস বাড়ানো যায় না। আসলে আধুনিকীকরণের কোনও ইচ্ছা বা আগ্রহই নেই কলকাতার তিন বড় ক্লাবের কর্তাদের। আগামী দিনে এর জন্য হয়তো হাহুতাশ করতে হবে দুই বড় ক্লাবের সমর্থকদের।

No comments:

Post a Comment