Saturday, April 23, 2016

ওয়েস্টউডের দর্পচূর্ণ, চ্যাম্পিয়ন বেঙ্গালুরুকে পাঁচ গোল দিয়ে রানার্স মোহন বাগান

মোহন বাগান-৫           : বেঙ্গালুরু এফ সি-০
(কর্নেল গ্লেন-২, লেনি,
লুসিয়ানো, আজহার)


ব্রিটিশ কোচ ওয়েস্টউড গত তিন বছর বেঙ্গালুরু এফ সি’র কোচিংয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। বেঙ্গালুরুর ক্লাবটির অন্দর মহলে তিনি ‘অ্যাশ’ নামে পরিচিত। শনিবার সন্ধ্যায় সেই অ্যাশের দলকে আক্ষরিকঅর্থেই ‘ভস্ম’ করে দিল সঞ্জয় সেনের মোহন বাগান। ৪০ দিন পর জয়ে ফিরল সবুজ মেরুন ব্রিগেড। রাজকীয় সেই জয়। বেঙ্গালুরুকে যে এইভাবে মোহন বাগান চূর্ণ করবে তা ক্লাবের অতি বড় সমর্থকরাও ভাবেননি। তবে গত দিন দুয়েক কোচ সঞ্জয় সেন আর মোহন বাগান ফুটবলারদের সঙ্গে কথা বলে মনে হচ্ছিল আই লিগ চ্যাম্পিয়ন না হওয়ার জন্য তাঁদের ভিতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। ভিতরের সেই জ্বালা থেকে ম্যাচটি জিততে মরিয়া ছিল তারা। মোহন বাগান ফুটবলারদের মনের জ্বালা আরও বাড়িয়ে দেয় বেঙ্গালুরু এফ সি’র কোচ ওয়েস্টউডের একটি সিদ্ধান্ত। চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাওয়ার জন্য তিনি মোহন বাগান ম্যাচটিকে গুরুত্বই দেননি। আগামী বুধবার লাওসের টিমের বিরুদ্ধে এ এফ সি কাপের ম্যাচটিকে ওয়েস্টউড অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন। তাই প্রথম একাদশের সাতজন ফুটবলারকে না খেলিয়ে দ্বিতীয় দল নামান মোহন বাগানের বিরুদ্ধে। যা দেখে আরও তেতে যান গ্লেনরা। মাত্র চার মিনিটের মধ্যে মোহন বাগান চার গোলে এগিয়ে যায়। ওয়েস্টউড এদিন খেলাননি জন জনসন, রিনো অ্যানটাও, শঙ্কর, লিংডো, কিম, কলিন্স, সুনীল ছেত্রীদের। সুনীল ছেত্রী ম্যাচটি খেলতে চেয়েছিলেন। তিনি শুক্রবার হোটেলে বসে বলেছিলেন,‘শনিবার জিতেই ট্রফি নিতে চাই। গত রবিবার সালগাওকরকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলেও ফেডারেশন বেঙ্গালুরুকে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি দেয়নি। শনিবার কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামে চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি দেয় ফেডারেশন। আতস বাজির প্রদর্শনীও ছিল। কিন্তু বেঙ্গালুরুর সেলিব্রেশন মুড নষ্ট করে দিল মোহন বাগান। ১৯৯৯-২০০০ সালের আই লিগে মোহন বাগান দুই ম্যাচ আগেই চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায়। ২১ তম রাউন্ডে মোহন বাগানের খেলা ছিল ইস্ট বেঙ্গলের বিরুদ্ধে। চ্যাম্পিয়ন মোহন বাগানকে সেদিন ৩-১ গোলে হারিয়েছিল সুভাষ ভৌমিকের প্রশিক্ষণাধীন ইস্ট বেঙ্গল। এদিন ম্যাচ দেখতে দেখতে সেই কথা মনে পড়ছিল ফুটবলপ্রেমীদের। চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরবর্তী ম্যাচে হয়তো মোটিভেশন থাকে না। কিন্তু যতই দ্বিতীয় দল খেলানো হোক না চ্যাম্পিয়ন দল রানার্স মোহন বাগানের কাছে পাঁচ গোল খেল! এটা বেঙ্গালুরু এফ সি’র লজ্জা। ফেড কাপের আগে এই গ্লানির হার সুনীল ছেত্রীদের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে। এক ম্যাচ আগে আই লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় ইদানীং কথাবার্তায় ওয়েস্টউডকে বেশ অহঙ্কারি মনে হচ্ছিল। সঞ্জয় সেনের দল তাদের যোগ্য জবাব দিল। গত মরশুমের মতোই মোহন বাগানকে এবার আই লিগে হারাতে পারল না বেঙ্গালুরু। দুই পর্বে সুনীল- লিংডোদের হারিয়েছে মোহন বাগান। তবুও মোহন বাগান যে চ্যাম্পিয়ন হতে পারল না তাতে সনি নর্ডির চোট, ডার্বিতে জেজের পেনাল্টি মিসের পাশাপাশি ফেডারেশনের সাহায্য বেঙ্গালুরু পেয়েছে। ফুটবল হাউসের সক্রিয় সহযোগিতা না পেলে বেঙ্গালুরুর পক্ষে এবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া যে সহজ হত না তা কাঞ্চনজঙ্ঘায় প্রমাণিত হয়ে গেল। ১৩, ১৪ রাউন্ডে মোহন বাগানের পর খেলেছে বেঙ্গালুরু। যা সুনীলদের অ্যাডভানটেজ হয়ে যায়। আর আই লিগের খেতাবি লড়াইয়ের অন্যতম ম্যাচ ছিল ইস্ট বেঙ্গল- বেঙ্গালুরু। ওই ম্যাচের আগে অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে যে ভাবে অর্ণব মন্ডলকে ফেডারেশন সাসপেন্ড করল তা এককথায় নজিরবিহীন। ইস্ট বেঙ্গল ম্যাচে কিম-সুনীলরা অ্যাডভানটেজ পেয়ে যান। মোহন বাগান, ইস্ট বেঙ্গলের মতো জনভিত্তি থাকলে ওয়েস্টউড সাত জন নিয়মিত ফুটবলার ছাড়া টিম নামানোর জন্য সমর্থকদের কাছে খলনায়ক হয়ে যেতেন। হয়তো কর্পোরেট কোটার টিম বলে ওয়েস্টউড অতটা সমালোচিত হবেন না।
এদিন কোনও বিভাগেই মোহন বাগানের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেননি বেঙ্গালুরু। কর্নেল গ্লেন ৭১ মিনিটে সহজ সুযোগ নষ্ট না করলে হ্যাটট্রিক করতে পারতেন। দু’বার অমরিন্দার সিং মোহন বাগানের আজহার ও গ্লেনের কাছ থেকে দুটি অব্যর্থ গোল বাঁচান। বেঙ্গালুরুর সেই ভাবে আক্রমণ হয়তো ছিল না। কিন্তু শেষ দিকে লুসিয়ানো একটু বেদম হয়ে পড়ায় সি কে বিনীথ দুই বার গোল করার মতো অবস্থায় চলে গিয়েছিল। কিন্তু তৎপরতার সঙ্গে বিনীথের পা থেকে বাঁচান অর্ণব দাসশর্মা। দীর্ঘ দিন পর খেলতে নামলেও তিনি আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন মোহন বাগান বারপোস্টের নীচে। তাই ছয় ম্যাচ পর মোহন বাগান এই ম্যাচে কোনও গোল খায়নি।
সাইড ব্যাকে খেলা কিগান পেরেরাকে অ্যাশ কেন স্টপারে খেলালেন তা বোঝা গেল। কিগান মোহন বাগানের ত্রিফলা’কে কিভাবে রুখবেন তা বুঝতেই পারছিলেন না। ওসানোর সঙ্গে তাঁর কোনও বোঝাপড়াও ছিল না। ৫৯ মিনিটে দ্বিতীয়বার হলুদ কার্ড দেখে মারচিং অর্ডার পান তিনি। বেঙ্গালুরু শেষ ৩১ মিনিটে ১০ জনে হয়ে গেলেও মোহন বাগান এক গোলের বেশি পায়নি। ডেঞ্জার জোনে দ্বিতীয়ার্ধে তিনটি ফ্রিকিক পেয়েছিল মোহন বাগান। সনি নর্ডি এবং কাটসুমি ঠিকমতো ফ্রিকিক নিতে পারলে মোহন বাগান হাফ ডজন গোল পেয়ে যায়। বেঙ্গালুরু যতই চ্যাম্পিয়ন হোক, ইতিহাসে লেখা থাকবে মোহন বাগানের এই বিশাল জয়।
আট মিনিটে মোহন বাগানের প্রথম গোল। বাঁদিক থেকে সনি নর্ডির নিঁখুত সেন্টারে দুই স্টপারের মাঝখান দিয়ে হেডে গোল করে যান কর্নেল গ্লেন। জন জনসন পাশে না থাকায় ওসানোকে এদিন বেশ নার্ভাস দেখাচ্ছিল। সনি- কাটসুমির কাছ থেকে বল পেয়ে লেনি রডরিগস ২-০ গোলে এগিয়ে দেন মোহন বাগানকে। ২২ মিনিটে তৃতীয় গোল পায় মোহন বাগান। কাটসুমির ফ্রিকিকে আগুয়ান লুসিয়ানো ৩-০ করেন। লেনির ক্রস কর্নেল মিস করলে শেষ মুহূর্তে হেডে গোল করেন আজহার। আই লিগে এটি আজহারের প্রথম গোল। দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি মোহন বাগানের হয়ে পঞ্চম গোল করেন কর্নেল গ্লেন। ১৬ ম্যাচে ৩০ পয়েন্ট নিয়ে মোহন বাগান রানার্স হল। ইস্ট বেঙ্গলের তৃতীয় হওয়াও নিশ্চিত হল। ‌ইস্ট বেঙ্গলের পয়েন্ট এখন ১৫ ম্যাচে ২৫।

Source : Bartaman

No comments:

Post a Comment