Saturday, April 23, 2016

বাড়িতে 'ধন্যি মেয়ে' দীপা

কিরীটী দত্ত:‌ ইলিশ মাছ খেতে ভালবাসেন দীপা। তাই মেয়ের প্রিয় খাবার আনতে শুক্রবার সাতসকালে মহারাজগঞ্জ বাজারে যান বাবা দুলাল কর্মকার। মা–‌বাবার ইচ্ছে ছিল গর্বের মেয়ে ঘরে ফেরার পর ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ানোর। কিন্তু পরে কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দী সতর্ক করলেন। কোনওভাবেই যেন দীপার ওজন বেড়ে বা কমে না যায়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়ার জন্য দীপার মা গৌরী কর্মকারকে বলেন বিশ্বেশ্বর। 


আচমকা কোচের ওই সতর্কবাণী শুনে প্রথমে চমকে উঠেছিলেন গৌরীদেবী। পরে নিজেকে সামলে তিনি বলেন, ‘‌সত্যিই তো, ও আর সেই ছোট্ট টিনা (‌দীপার বাড়ির নাম)‌ নেই। ও এখন দেশের সম্পদ। দেশের মেয়ে। সারা দেশ এখন তাকিয়ে আছে ওর দিকে। তাই ওর ক্ষতি তো আমি করতে পারি না।’‌ তবে অন্য সব পরিকল্পনা বাদ দিলেও সিদ্ধান্ত নেন মেয়েকে হালকা ঝোল করে ইলিশ মাছ খাওয়াবেন। সেইমতো রান্না করলেন এবং নিজের হাতে খাওয়ালেনও। স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত করে এদিন সকালে নিজের রাজ্য ত্রিপুরায় ফিরলেন ভারতীয় জিমন্যাস্টিক্সের আইকন দীপা কর্মকার। স্বপ্ন পূরণ করতে সময় লাগল ৬২৬ দিন। ২০১৪ সালের ২১ জুলাই স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোয় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ জিমন্যাস্টিক্সে ব্রোঞ্জ পদক জেতার পরই ত্রিপুরার তৃতীয় অর্জুন পুরস্কার প্রাপ্ত দীপা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, ‘‌অলিম্পিকে যাওয়াই আমার একমাত্র লক্ষ্য।’‌ সেই লক্ষ্য পূরণ করে এদিন সকালে ইন্ডিগোর বিমানে দিল্লি থেকে আগরতলায় এলেন ‌দীপা‌ এবং তাঁর কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দী। রাজ্যের অহঙ্কার দীপাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য ক্রীড়া পর্ষদের সচিব দিলীপ চক্রবর্তী, রাজ্য স্কুল স্পোর্টস বোর্ডের সচিব অরিন্দম গাঙ্গুলি, ত্রিপুরা জিমন্যাস্টিক্স সংস্থার সহ সভাপতি মানিক সাহা, দীপার প্রাক্তন কোচ সোমা নন্দী, রাজ্য অলিম্পিক সংস্থার সচিব সুজিত রায় প্রমুখ। এ ছাড়া রাজ্যের বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থার কর্তারা উপস্থিত ছিলেন। চিত্র সাংবাদিকদের ভিড়ে বিমানবন্দরের লাউঞ্জ থেকে বেরোতে হিমশিম খেতে হয়েছে দীপা এবং তাঁর কোচকে। তার পরও হাসিমুখে সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন দীপা। রিও থেকে দীর্ঘ ২২ ঘণ্টার বিমানযাত্রার ফলে এমনিতেই ক্লান্ত দীপা। তার পরেও বাড়িতে এসে দীপা পূজা এবং বোনঝি রিয়াকে পেয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন। দেখে মনে হল খুশির ঝর্না খরস্রোতা হতে চাইছিল। সাফল্যের শৃঙ্গে উঠেও দীপার পা কেন মাটিতে তা বোঝা গেল ওঁর একটি উত্তরেই। প্রশ্ন করা হয়েছিল, রাতারাতি সেলিব্রিটি হয়ে কেমন লাগছে?‌ উত্তরে দীপা বলেন, ‘‌আমি সেলিব্রিটি নই। আমি উজান অভয়নগরের ছোট্ট মেয়ে দীপা। কঠোর পরিশ্রম, হার না মানা মানসিকতা এবং সবার আশীর্বাদে কিছুটা এগোলাম। সবাই আশীর্বাদ করুন যাতে অলিম্পিকে দেশের নাম উজ্জ্বল করে আসতে পারি।’‌ দেশের প্রথম মহিলা জিমন্যাস্ট হিসেবে রিও অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জন করায় দীপার অনুশীলনের জন্য সাই এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় ৮০  লাখ টাকার সরঞ্জাম কিনছে। এ ছাড়া বিদেশে একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এবং ব্যক্তিগত কিছু সরঞ্জাম কেনার জন্য দীপাকে দেওয়া হচ্ছে আরও ৩০ লাখ টাকা। জানিয়েছেন দীপার গর্বিত কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দী। দীপা অলিম্পিকের ছাড়পত্র পাওয়া সত্ত্বেও চিন্তিত কোচ। কোনও রাখঢাক না রেখেই বললেন, ‘‌অলিম্পিকে পদক পেতে হলে এখন যে পারফরমেন্স করছে তার থেকে আরও ৪০ শতাংশ ভাল করতে হবে। না হলে সাফল্য পাওয়া কঠিন। সেটা মাথায় রেখেই অনুশীলন করাব এখন।’‌ ১ মে অলিম্পিকের প্রস্তুতির জন্য দিল্লি ফিরে যাবেন দীপা এবং ওঁর কোচ। তবে বাড়িতে এসে বসে থাকার পাত্র নন বিশ্বেশ্বর। সিদ্ধান্ত নেন, ২৫ এপ্রিল থেকে বাধারঘাট জিমন্যাসিয়াম হলে দীপাকে নিয়ে নেমে পড়বেন অনুশীলনে। প্রিয় ছাত্রীকে চূড়ান্ত সাফল্যের স্বাদ পাওয়াতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কোচ।‌‌

No comments:

Post a Comment